শিল্প খাতে পানি ব্যবস্থাপনা নীতির খসড়া প্রকাশ

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও বেশি মূল্য নির্ধারণ করবে সরকার

পানিসম্পদ রক্ষায় ‘শিল্প খাতে পানি ব্যবস্থাপনা নীতি-২০২৫’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে এ নীতির একটি খসড়া প্রকাশ করেছে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা।

পানিসম্পদ রক্ষায় ‘শিল্প খাতে পানি ব্যবস্থাপনা নীতি-২০২৫’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে এ নীতির একটি খসড়া প্রকাশ করেছে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা। এ খসড়ায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কোনো একটি জনপদ বা জনগোষ্ঠীর জন্য পানির প্রাপ্যতা বিঘ্নিত না হওয়ার বিষয়টি।

খসড়ায় বলা হয়, কোথাও নতুন শিল্প স্থাপন করতে গেলে ওই এলাকার পানিসম্পদের ওপর কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন মিলবে। এছাড়া কোথাও যদি পানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর পানির প্রাপ্যতা বিঘ্নিত হয়, তবে সরকার সেখানে শিল্প খাতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করবে। এছাড়া চিহ্নিত পানি সংকটাপন্ন এলাকার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুষ্প্রাপ্যতার তীব্রতা বিবেচনায় এর মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে অধিক দুষ্প্রাপ্য এলাকার পানির মূল্য অধিক হারে নির্ধারণ করা হবে।

শিল্প খাতে পানি ব্যবস্থাপনা নীতির খসড়ায় চারটি লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো নিরাপদ ও সর্বোত্তম পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সমৃদ্ধ এবং টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন; সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য অর্জনে সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও টেকসই পরিবেশসম্মত শিল্পায়ন; শিল্প খাতে পানিসম্পদের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহ ও পানি-সংক্রান্ত সেবাগুলো নিশ্চিত করা এবং সর্বশেষটি হলো আধুনিক ও লাগসই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প খাতে সম্ভাব্য জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিবেচনায় পানি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন।

পানি ব্যবস্থাপনা নীতির উদ্দেশ্য সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে শিল্প খাতে পানি ব্যবহার সর্বোত্তমকরণ; পানির বিকল্প উৎসগুলো চিহ্নিতকরণ এবং অপচয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; শিল্প খাতে সমন্বিত পানির চাহিদা নিরূপণ ও মূল্য নির্ধারণ; শিল্পবর্জ্যজনিত পানিদূষণ হ্রাসকরণ; কার্যকর পরিবীক্ষণের মাধ্যমে নীতিমালা বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ; টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসহ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা এবং শিল্প খাতে পানি ব্যবহারের নিয়মিত নিরীক্ষণ।

পানির মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কে খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, পানি একটি সীমিত ও সংকটাপন্ন সম্পদ। এ সম্পদের সংরক্ষণ ও দুষ্প্রাপ্যতা অনুধাবনের ক্ষেত্রে এর মূল্য ভূমিকা পালন করবে। ব্যবহারযোগ্য পানির দুষ্প্রাপ্যতা বিবেচনায় যথাযথ মূল্যায়ন ও সমীক্ষার ভিত্তিতে এর মূল্য নির্ধারণ করা হবে। পানির মূল্য কাঠামো এর সরবরাহকারী ও সেবাগ্রহীতার লক্ষ্য ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য পানির মূল্য তুলনামূলক কম এবং বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি এবং পৃথক মূল্য ধার্য করা হবে। ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির মূল্য যথাসম্ভব সরবরাহসেবার প্রকৃত মূল্য দ্বারা নির্ধারিত হবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, পানির ছায়ামূল্য (শ্যাডো প্রাইস অব ওয়াটার) নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে প্রান্তিক ক্ষতি ব্যয় (মার্জিনাল ড্যামেজ কস্ট) ও প্রান্তিক হ্রাস ব্যয় (মার্জিনাল অ্যাবেটমেন্ট কস্ট) দুটোই বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে পানির দূষণজনিত মধ্যবর্তী পর্যায়ে যেমন মানুষের স্বাস্থ্যহানি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস—এ দুটো বিবেচনায় শিল্প ক্ষেত্রে এর ছায়ামূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।

শিল্প খাতে মূল্য আরোপের ফলে পানি সংরক্ষণে দক্ষতা বাড়বে উল্লেখ করা হয়েছে খসড়ায়। এতে বলা হয়েছে, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পানি সংরক্ষণে ভালো করবে, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রণোদনা দেয়া হবে। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রভাব, পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেয়া হবে। এছাড়া পানি ব্যবহারের অঞ্চল, অববাহিকা, মৌসুম, শিল্পের শ্রেণী এবং ব্যবহারের ধরন অনুসারে পৃথকভাবে মূল্য নির্ধারণ করা যাবে। সংকটাপন্ন এলাকার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুষ্প্রাপ্যতার তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে এর মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে অধিক দুষ্প্রাপ্য এলাকায় পানির মূল্য অধিক হারে নির্ধারিত হবে। দেশীয় পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে আমদানি করা পানিতে অতিরিক্ত শুল্ক নির্ধারণ এবং পানির অপ্রতুলতা বিবেচনায় রফতানির ওপরও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, শিল্প খাতে পানি ব্যবহারের জন্য যেসব শিল্পশ্রেণী রয়েছে সেগুলোয় উৎপাদিত পণ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার তালিকা করতে হবে। এতে কোন শিল্পশ্রেণী আগে পানি পাবে তা নিশ্চিত করা যাবে।

পানির সর্বোত্তম বণ্টনের জন্য এর মালিকানা কোনো ব্যক্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত থাকবে উল্লেখ করা হয়েছে নীতিতে। এতে বলা হয়েছে, পানির ন্যায্য বণ্টন, কার্যকর উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকার পানি বণ্টনের অধিকার সংরক্ষণ করবে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পানির ব্যবহার সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে উল্লেখ করে নীতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩’ সাপেক্ষে পানিনির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা বিবেচনায় সারা দেশের ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির নিরাপদ আহরণসীমা নির্ধারণ করা হবে। সরকার জনগণকে অবহিত করে সংকটাপন্ন এলাকায় শিল্প খাতে পানি আহরণ নিয়ন্ত্রণ করবে।

এতে আরো বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে ঝরনার পানির ব্যাপক চাহিদা ও উচ্চমূল্য বিবেচনায় সরকারি উদ্যোগে এ পানি বাজারজাত ও বিদেশে রফতানি করা হবে।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পানি মানেই জীবন। এ সহজ সত্যটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তবু বাস্তবতা হলো আমাদের অমূল্য পানিসম্পদ আজ সংকটাপন্ন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের চ্যালেঞ্জ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব একত্রে আমাদের পানির ঘাটতি ও দূষণকে দেশের সবচেয়ে জটিল হুমকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে পরিণত করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌এখন ভূগর্ভস্থ পানি করপোরেট সেক্টর ফ্রি রিসোর্স হিসেবে নিচ্ছে। সেটা আর চলতে পারে না। এ সম্পদ সীমাহীন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এ যুগে বিনামূল্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন চলতে পারে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে আমরা ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির অভাবে ভুগছি। ঢাকা শহরের চারপাশে সাতটি নদী বয়ে চলছে। পৃথিবীতে কয়টি এমন শহর আছে? অথচ এ শহরের মানুষকে সুপেয় পানি দিতে মেঘনা পর্যন্ত যেতে হয়। দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি সময়ে নদীতে মৃত মাছ ভেসে ওঠে। এ নীতিমালা দূষণ কমানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে।’

আরও